শূন্য ভিটার ওপর দাঁড়িয়ে আছে ঘরের অবয়ব। নেই বেড়া, নেই ছাউনি। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, কেবল ঘরের কঙ্কাল দাঁড়িয়ে আছে। বৃষ্টির পানিতে ভিটার মাটি বহু আগেই ধুয়ে গেছে। এসব ঘরে এখন আর মানুষ বসবাস করে না, থাকে না গরু-ছাগলও। এটি নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার চর আতাউরে ভূমিহীনদের জন্য নির্মিত গুচ্ছ গ্রামের বর্তমান চিত্র।
ভূমিহীনদের পূর্ণবাসনের লক্ষ্যে বিগত সরকার বিভিন্ন চরে গুচ্ছ গ্রাম নির্মাণ করে। হাতিয়ার তমরদ্দি ইউনিয়নের পশ্চিম পাশে চর আতাউরে ১২ একর জমিতে ‘তরুবিথী’ ও ‘ছায়াবিথী’ নামে দুটি গুচ্ছ গ্রাম নির্মাণ করা হয়। ২০১৯ সালের শেষ দিকে প্রকল্পটির কাজ শেষ হয়। এতে প্রতিটি গুচ্ছ গ্রামে ৫০টি করে মোট ১০০টি পরিবারের জন্য ঘর নির্মাণ করা হয়। প্রতি ৫০টি পরিবারের জন্য চারটি নলকূপ ও একটি করে পুকুর খনন করা হয়।
প্রতিটি পরিবারকে একটি করে ইউনিট দেওয়া হয়, যেখানে ছিল একটি শৌচাগার, একটি রান্নাঘর ও দুটি থাকার কক্ষ। লোহার পাতের ওপর টিন দিয়ে তৈরি করা এসব ঘর ছয় বছর না যেতেই বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। একাধিকবার ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে ঘরগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘদিন ধরে কোনো ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ না থাকায় শতাধিক পরিবারের অনেকেই সরকারি এই বাসস্থান ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
তরুবিথী গুচ্ছ গ্রামের ৩১ নম্বর ঘরে বসবাস করেন সুমা বেগম। তিনি বলেন, নদীভাঙনে অনেক আগেই সব হারিয়েছেন। তার স্বামী ইটভাটার শ্রমিক। চার সন্তান নিয়ে ২০২০ সালের দিকে তারা এই চরে বসবাস শুরু করেন। সরকারি ভাবে গুচ্ছ গ্রামের একটি ঘর পেলেও তিন বছরের মধ্যেই ঝড়ে ঘরটি ভেঙে পড়ে। দরজা-জানালা নষ্ট হয়ে গেছে। কোনো রকমে দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখে তারা এখনো সেখানে বসবাস করছেন। তিনি জানান, নদীর তীরঘেঁষা পূর্ব পাশের বেশির ভাগ ঘরই সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে। মেরামতের অযোগ্য হওয়ায় সেসব ঘরের বাসিন্দারা অন্যত্র চলে গেছেন।
তরুবিথীর পাশেই ছায়াবিথী গুচ্ছ গ্রাম। সেখানে ৫০টি পরিবারের মধ্যে বর্তমানে মাত্র সাতটি পরিবার বসবাস করছে। বাকি ঘরগুলোর দরজা-জানালা ও বেড়া কিছুই নেই।
ছায়াবিথী গুচ্ছ গ্রামের ৩৯ নম্বর ঘরে বসবাস করেন নিখি রানী দাস। তার স্বামী একজন মৌসুমি শ্রমিক। নিখি রানী বলেন, গত পাঁচ বছর ধরে তারা এই চরে বসবাস করছেন। নদীর তীরে হওয়ায় এবং আশপাশে কোনো গাছপালা না থাকায় সামান্য ঝড়েই ঘরগুলো ভেঙে পড়ে। অনেক ঘরের পিলার ক্ষয়ে চিকন হয়ে গেছে। অসংখ্য ঘরের চালের টিন ও বেড়া উড়ে গেছে। কোথাও শুধু লোহার পাত পড়ে আছে। ফলে অনেক পরিবার অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছে।
নিখি রানী আরও বলেন, এখানে আসার আগে তাদের জীবিকার ব্যবস্থা ও নানা সুযোগ–সুবিধা দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তার কিছুই বাস্তবায়ন হয়নি। ঘর ভেঙে পড়লেও সরকারি ভাবে কোনো সহায়তা পাওয়া যায়নি। কোথাও যাওয়ার জায়গা না থাকায় অনেকেই বাধ্য হয়ে এসব ঝুঁকিপূর্ণ ঘরেই বসবাস করছেন।
চরের প্রথম দিকের বাসিন্দা খোকন মাঝি বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের মাধ্যমে এসব ঘর নির্মাণ করা হয়। কিন্তু নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের কারণে অল্প সময়েই ঘরগুলো ভেঙে পড়ে। এ ছাড়া গুচ্ছ গ্রামের জন্য স্থাপন করা গভীর নলকূপগুলো বিকল হয়ে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। দুটি পুকুর খনন করা হলেও জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়ে সেগুলো এখন প্রায় সমতল হয়ে গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, হাতিয়ার মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ২০ মিনিট ট্রলারে পাড়ি দিয়ে চর আতাউরের এই গুচ্ছ গ্রামে যেতে হয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারানো অসহায় পরিবারগুলো এখানে আশ্রয় নেয়। সীমিত আয় ও সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও একটি স্থায়ী ঠিকানার আশায় তারা এখানে বসবাস শুরু করেন। কিন্তু বারবার ঝড়-তুফান ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে তাদের পাশে দাঁড়ানোর কেউ নেই। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত এসব পরিবার মানবেতর জীবন যাপন করছে। তাদের একটাই দাবি-শেষ আশ্রয় এই ঘরগুলো যেন দ্রুত মেরামত করে বসবাসের উপযোগী করে দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দিন বলেন, চর আতাউরের গুচ্ছ গ্রামগুলোতে অনেক অসহায় মানুষ বসবাস করছে। এসব পরিবারকে শীতবস্ত্র, ত্রাণসহ বিভিন্ন সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে একটি পুকুর খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে গুচ্ছ গ্রামের ঘরগুলো মেরামতের জন্য এখনো কোনো বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। বরাদ্দ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



